বাঙালি রুখিয়া দাঁড়াও
১৯৬৪ সালে কাশ্মীরের একটি ধর্মস্থানে রক্ষিত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার চুল চুরি হয়েগেছে । পরিকল্পিত ভাবে এমন একটি মিথ্যাকে ছড়িয়ে দেওয়ার পর,ভারতীয় উপমহাদেশের বিচার -বোধহীন গুজবপ্রিয় মানুষ জড়িয়ে পড়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়।
১৯৬৪সালে ওই গুজবকে ভিত্তি করে, পূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থানে উর্দুভাষী দাঙ্গাবাজরা ঝাপিয়ে পড়ে হিন্দু বাঙালিদের ওপর ।
ওই হামলা বা দাঙ্গা প্রতিরোধে পূর্ব বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল “বাঙালি রুখিয়া দাঁড়াও” এই আহ্বান বা স্লোগানকে সামনে রেখে ।
এতেই পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল দাঙ্গাবাজরা ।ওই আহ্বানের সাত বছরের মধ্যে, পূর্ব বাংলার বাঙালি ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে বহু রক্তের বিনিময়ে, উর্দুভাষী পাকিস্তানি শাসকদের কবল থেকে ছিনিয়ে আনে রক্তিম স্বাধীনতা ।
পূর্ব বাংলায় দাঙ্গার প্রধান সংগঠক যেমন ছিল উর্দুভাষীরা, তেমনি এপার বাংলার দাঙ্গার প্রধান দুই সংগঠক হিন্দিভাষী হিন্দু ও উর্দুভাষী মুসলমান । এবং দাঙ্গার এক প্রধান বৈশিষ্ট্য শহর কেন্দ্রীকতা । কারণ কলকাতা সহ বাংলার বিভিন্ন জেলা শহরগুলিতে এদের প্রধান প্রতিপত্তি । অবশ্য বিগত কয়েক দশকে এদের প্রভাব প্রতিপত্তি গ্রাম বাংলায়ও প্রসারিত ।
১৯৯২-এ দাঙ্গাও পশ্চিম বাংলায় সংগঠিত হয়েছিল, কলকাতা, হাওড়া ও পুরুলিয়া জেলা শহরে । এবং ওই দাঙ্গার প্রধান দুই সংগঠক ছিল উর্দুভাষী মুসলমান এবং হিন্দিভাষী হিন্দু দাঙ্গাবাজরা । তৎকালীন কলকাতার নগরপাল তুষার তালুকদার “আজকাল” পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই সত্যকে স্বীকার করে ছিলেন ।
এই সূত্রেই উল্লেখ করা হচ্ছে দু-পারের দুই চিন্তাবিদের দুটি মূল্যবান মন্তব্য:
১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ : “আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়েও বেশি সত্য আমরা বাঙালি । এটা কোনও আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা । মা-প্রকৃতি আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে তা ঢাকবার জোটি নেই ।”
প্রবোধ চন্দ্র সেন : “বাংলার হিন্দু-মুসলমান সমস্যা এবং বিহার উত্তর প্রদেশের সমস্যা, গুরুত্ব ও প্রকৃতিতে এক নয়। সুতরাং বাঙালির এই সমস্যার সমাধান হতে পারে শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস শিক্ষার আলোকে । সামগ্রিকভাবে ভারত ইতিহাসের সহায়তায় বাংলার এই সমস্যা নিরসন সম্ভব নয় ।”
‘মছলি’ খাওয়া বাঙালি যেমন উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের কাছে হিন্দু নয়, তেমনি উর্দুভাষী মুসলমানদের কাছেও বাঙালি মুসলমান, মুসলমান নয় ।
প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায়, ১৯৮২ সালে উইলিয়াম হান্টারের শিক্ষা কমিশনে ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতায় উর্দুভাষী নবাব আব্দুল লতিফ-এর মন্তব্য : “ বাংলা মুসলমানের ভাষা নয় . . . ।”
এপার বাংলায় বহিরাগত দাঙ্গাবাজদের পরিকল্পিত এবং সংগঠিত দাঙ্গা প্রতিরোধে, প্রধান হাতিয়ার বাংলা ভাষা ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী বাঙালি ঐক্য চেতনা ।
কিন্তু বাংলা ভাষাটাই যেখানে সব থেকে বেশি অবহেলিত, নির্যাতিত, লাঞ্ছিত এবং আগ্রাসী হামলার শিকার হয়ে, অবলুপ্তির পথে, সেখানে ওই চেতনাও হবে না এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও বন্ধ হবে না. . . ।
মাঝে মাঝে এমন দাঙ্গা লাগানো হবে, এবং পুলিশ অথবা মিলিটারি দিয়ে তা বন্ধ করার পর ( ভাষা, ধর্ম, জাত-পাত সব একাকার করে ) গর্বিত উচ্চারণ শোনা যাবে। —– এখানে ভাষা-ধর্ম-জাত-পাত নিয়ে কোন দাঙ্গা হয় না . . . ।
মনে রাখা ভালো, পুলিশ, মিলিটারি দিয়ে দাঙ্গা বন্ধ করা যায়, কিন্তু মানুষের মন থেকে সাম্প্রদায়িক বিষের শিকড় উপরে ফেলা যায় না।
(সংগৃহীত)